কলকাতা, ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫: পশ্চিমবঙ্গের বেতনভাতা ও বড় সরকারি কর্মচারীদের Dearness Allowance (DA) ইস্যু তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় DA-সম্পর্কিত মন্তব্যে জোর কণ্ঠে দাবি করেন যে কেন্দ্রের নীতি অনুযায়ী রাজ্য সরকারের পক্ষে পর্যাপ্ত অর্থ নেই এবং DA-বৃদ্ধির দাবিটি অপরিপক্ব ও বাস্তবসম্মত নয়। এই মন্তব্য মুখ্য সচিব মলয় মুখোপাধ্যায় সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরকারি কর্মীর ক্ষোভ উস্কে দেয় এবং রাজ্য রাজনীতিতে নতুন জলঘোলা ফেলে।
মমতার DA মন্তব্যে বিপজ্জনক দাবি?
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি ছিল, রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে DA বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়, এবং কেন্দ্রের অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে রাজ্য সরকারের হাতে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। এতে করে চাকরি জীবনের নিরাপত্তা আশা করা কর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকেই অভিযোগ করেন, মুখ্যমন্ত্রী সমস্যার মূলটাকে বিকৃতভাবে তুলে ধরেছেন এবং সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক দাবিকে ছোট করে দেখেছেন।
এ প্রসঙ্গে সমালোচকরা মনে করেন, মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য “মারাত্মক মিথ্যে” ও বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে না, বিশেষ করে যখন রাজ্যের কর রাজস্ব ও উন্নয়ন তহবিলের বড় অংশ প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে।
মলয় মুখোপাধায়ের পাল্টা মন্তব্য
এই বিতর্কের উত্তাপে রাজ্য সরকারি প্রধান সচিব মলয় মুখোপাধ্যায় দুপুরে বক্তব্য দেন, “মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। রাজ্য সরকার সবসময়ই কর্মচারীদের মঙ্গল চায় এবং বাজেটের পার্থিব সীমাবদ্ধতাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ সম্ভব সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। DA-এর বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছি।”
এই মন্তব্যেও কর্মচারী ও রাজনৈতিক বিরোধীরা সহজে সন্তুষ্ট হননি। অব্যাহত সমালোচনায় বক্তারা বলেন, “সরকার প্রতিদিনই ব্যয় বাড়াচ্ছে, উন্নয়ন প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে; কিন্তু ‘DA-বৃদ্ধি’ নিয়ে যখন কথা আসে তখন ‘অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা’ বোঝানো হচ্ছে—এটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।”
সরকারি কর্মচারীদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সরকারি কর্মচারী সংগঠন ও ইউনিয়নগুলো তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য:
“আমরা সার্বিক মূল্যস্ফীতির চাপ সরাসরি অনুভব করছি।”
“DA-বৃদ্ধিতে অন্য রাজ্যগুলো আগাইছে, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে যাচ্ছে।”
“মমতার বক্তব্য বাস্তবসম্মত নয়—এতে কর্মচারীদের আস্থা কমছে।”
এক ইউনিয়ন নেতা বলেন, “মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে — খাবার, পরিবার, চিকিৎসা সবকিছুতে চাপ। অথচ সরকার DA-বাড়াতে প্রস্তুত নয়, বরং দাবি ভুল বলছে — এটা কাম্য নয়।”

DA বিষয়ক বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপট
Dearness Allowance বা DA একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সমন্বয় করা হয় মূল্যস্ফীতির সাথে মিলিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে DA-সম্পর্কিত দাবি উঠছে এবং বহু রাজ্য কেন্দ্রীয় নির্দেশনার ভিত্তিতে এটি পর্যায়ে পর্যায়ে বৃদ্ধি করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার দীর্ঘসময় ধরে DA-বৃদ্ধিতে টালবাহানা করছে বলে সমালোচকদের দাবি। কর্মচারীরা মনে করেন, “…সরকার অর্থনৈতিক অজুহাতকে অতিক্রম করে DA-বৃদ্ধি ও বেতন সংস্কারের জন্য আরো উদ্যোগ নেওয়া উচিত।”
রাজনৈতিক পরিণতি
এই ইস্যুটি ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে উত্তাপে ঠেকেছে। বিরোধী দলের নেতারা সাফ বলেছেন যে মমতা সরকার “গণমানুষের অর্থনৈতিক চাপকে নেহাত ছোট করে দেখছেন।” তারা DA-সংক্রান্ত এই বিতর্ককে ভোটারদের আস্থা হারানোর ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন এবং দাবি করেছেন যে রাজ্য সরকার অর্থনৈতিক ব্যয় ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা উচিত।
এক প্রভাবশালী বিরোধী নেতা বলেন, “আপনি যদি মর্যাদাপূর্ণ নীতিতে বিশ্বাস করেন, তাহলে DA-সংক্রান্ত দাবি রাজনৈতিক ভাবেও বিবেচনা করা উচিত, কেবল অজুহাত নয়।”
কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ আশা
কেউ কেউ অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানাচ্ছেন যে আগামী বাজেট বিবেচনার পরেই DA-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। কিন্তু কর্মচারীদের মধ্যে একটি সাধারণ অনুভূতি রয়েছে — “আমরা বাস্তব জীবনে মূল্যস্ফীতি অনুভব করি ও DA-বৃদ্ধির দাবি করছি; সরকার যদি তা যদি উপেক্ষা করে বা অগ্রাহ্য করে, তাহলে অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে প্রশ্ন উঠবে।”
এক সরকারি কর্মচারী বলেন, “সরকার আমাদের মূল্যায়ন না করলে আমরা কীভাবে মর্যাদাপূর্ণভাবে জীবনযাপন করব?”
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের DA-সংক্রান্ত মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে এমন এক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে যা রাজ্য রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে এবং কর্মচারী সমাজের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়াচ্ছে। DA-সম্পর্কিত মৌলিক দাবি নিয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া ও মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে ভুল করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে।
এই ইস্যু ভবিষ্যতে রাজ্য রাজনীতিতে আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে এবং ২০২৬-এর রাজনৈতিক মঞ্চে আলোচনার এক বড় বক্তব্য হিসেবে থেকে যাবে।






