রাজনৈতিক সাফল্যের পর ভারতের অর্থনীতিতে বড়সড় বদলের প্রস্তুতি
ভারতের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে আবারও বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটতে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী মোদি সরকার এবার অর্থনৈতিক নীতিতে একাধিক যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংসদের ভেতরেই শাসক জোটের সাংসদদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—দেশের জন্য এবার শুরু হতে চলেছে এক ধরনের “রিফর্ম এক্সপ্রেস”।
গত কয়েক সপ্তাহে সংসদের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন শেষ হয়েছে, যেখানে অর্থনীতি-কেন্দ্রিক বহু সিদ্ধান্তে সিলমোহর পড়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল বিমা ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা তুলে নেওয়া এবং পারমাণবিক শক্তি খাতে বেসরকারি সংস্থার প্রবেশের অনুমতি। এর পাশাপাশি সরকার আগেই ভারতের কাস্টমস শুল্ক ব্যবস্থায় বড়সড় সংস্কারের ঘোষণা করেছে।
জিএসটি ও শ্রম আইনে বড় পরিবর্তন

গত কয়েক মাসে জটিল জিএসটি কাঠামোকে সরল করে চারটি করহার থেকে কমিয়ে দু’টিতে আনা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য—ব্যবসা সহজ করা ও ভোক্তা চাহিদা বাড়ানো। একই সঙ্গে বহু প্রতীক্ষিত শ্রম আইন সংস্কার কার্যকর করার পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হল অসংগঠিত ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা, ছোট ব্যবসার উপর প্রশাসনিক চাপ কমানো এবং সামাজিক সুরক্ষা বিস্তৃত করা।
এছাড়াও, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমতির ফলে ভারতীয় ব্যাঙ্কগুলি এখন মার্জার ও অধিগ্রহণ সংক্রান্ত অর্থায়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারবে।
রাজনৈতিক শক্তি ও বৈশ্বিক চাপ
গত লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও, সাম্প্রতিক একাধিক রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য প্রধানমন্ত্রীকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি জুগিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ‘পলিটিক্যাল ক্যাপিটাল’ তাঁর হাতে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও চাপ বাড়াচ্ছে। আমেরিকার তরফে ভারতের উপর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ, চিনের সঙ্গে কৌশলগত টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে ভারতকে নতুনভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে হচ্ছে। সরকার চাইছে, চিনের বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে ভারতকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে।
বিনিয়োগ বাড়ানোই মূল লক্ষ্য

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত সাফল্য আসবে তখনই, যখন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। যদিও অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো সংস্থা বিপুল বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে, তবু সামগ্রিক বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ এখনো গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে।
বর্তমানে ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্র জিডিপির প্রায় ১৭ শতাংশ, যেখানে সরকারের লক্ষ্য ছিল ২৫ শতাংশে পৌঁছানো। পাশাপাশি মজুরি বৃদ্ধিও থমকে রয়েছে, যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
২০৪৭-এর স্বপ্ন ও বড় চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর জন্য আগামী দুই দশক ধরে গড়ে প্রায় ৮ শতাংশ হারে জিডিপি বৃদ্ধি ধরে রাখা জরুরি। কিন্তু মার্কিন শুল্কনীতি, বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সমস্যা এই লক্ষ্যকে কঠিন করে তুলছে।
তবুও বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আন্তর্জাতিক চাপই মোদি সরকারকে দ্রুত সংস্কারের পথে হাঁটতে বাধ্য করছে। কৃষি ও দুগ্ধ খাতে বিদেশি বাজার পুরোপুরি খুলে দিতে সরকার এখনো সতর্ক—কারণ এতে দেশের কোটি কোটি কৃষকের স্বার্থ জড়িত এবং সামনের একাধিক রাজ্য নির্বাচনে এর রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে।
ধর্মনীতি থেকে অর্থনীতির দিকে নজর
মোদি সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল মুখ্য। অযোধ্যায় রাম মন্দির উদ্বোধন সেই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় প্রতীক। তবে এখন সরকারের দৃষ্টি স্পষ্টভাবে অর্থনীতির দিকে ঘুরছে। অনেকের মতে, রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের পর এবার অর্থনৈতিক সংস্কারই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
বিশেষজ্ঞদের কথায়, আগামী কয়েক বছরেই বোঝা যাবে এই ‘বিগ ব্যাং’ সংস্কার ভারতের অর্থনীতিকে কতটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পারে।







